মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

জগদ্দল বিহার

 

জগদল বৌদ্ধ বিহারঃ

 

          জগদল বিহার নওগাঁ জেলা সদর হতে প্রায় ৬৫ কিঃ মিঃ উত্তরে ধামইরহাট উপজেলার জগদল গ্রামে অবস্থিত।  বরেন্দ্র অঞ্চলের ৯১৭ বছরের প্রাচীন স্থাপত্য শিল্পের ব্যতিক্রম ধর্মী কিছু সংযোজন রয়েছে এই জগদল বৌদ্ধ বিহারে।

 

একাদশ শতকে বিদ্রোহী বঙ্গাল সৈন্য কর্তৃক পাহাড়পুর (সোমপুর) বিহার আক্রান্ত ও অগ্নিদগ্ধ হয়। এই বিশৃঙ্খলা এং বর্হিআক্রমণে পাল সাম্রাজের সার্বভৌম ম্লান হয়ে যায়।  বরেন্দ্র অঞ্চল কিছু কালের জন্য স্থানীয় কৈবত নায়ব দিব্যোক এবং তার ভ্রাতুষ্পুত্র ভীমের শাসনাধীনে চলে যায়। একাদশ শতকের শেষার্ধে ভীমকে পরাজিত করে রামপাল প্রিয় পিতৃভূমি বরেন্দ্র উদ্ধার করেন। তিনি প্রজা সাধারণের আকুন্ঠ ভালবাসা অর্জনের জন্য মালদহের সন্নিকটে রামাবতি নামক রাজধানী এবং এর নিকটবর্তী স্থানে জগদ্দল মহাবিহার (বিশ্ববিদ্যালয়)  প্রতিষ্ঠা করেন। এই বিহারে খ্যাতনামা বিদগ্ধ পন্ডিতগণ শিক্ষা প্রদান ও গবেষণার কাজে নিয়োজিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যেঃ বিভূতিচন্দ্র (একাধারে গ্রন্থাকার,টিকাকার,অনুবাদক এবং সংশোধক,তিনি কিছুদিন নেপালে ও তিববতে ছিলেন এবং তিববতীয় ভাষায় অনেক বই অনুবাদ করেছিলেন),আচার্য দানশীল (প্রায় ৬০ খানা তন্ত্র গ্রন্থের অনুবাদ করেছিলেন),আচার্য মোক্ষকর গুপ্ত (তর্কভাষা নামক বৌদ্ধ ন্যায়ের উপর তিনি একটি পুথি লিখেছিলেন),শুভাকর গুপ্ত (তিনি রামপালের সমসাময়িক এবং জগদ্দল বিহারের আচার্য ছিলেন)।

 

আনুমানিক ২০০০ সালে  এই বিহারের খনন কাজ  আরম্ভ করা হয়। এই খান থেকে সংগৃহীত মূল্যবান প্রত্ন সম্পদ ও উপকরণগুলি পাহাড়পুর যাদুঘরে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা আছে। খনন কাজ শেষে ধামইরহাটবাসীর সোনালী অতীত বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচিত হবে।

 

ইউনেস্কো ও ওয়াল্ড হেরিটেজের সম্ভাব্য তালিকায় জগদ্দল মহাবিহারের নাম রয়েছে। ২০১৩ সালে বিহারের খননে  জগদ্দল বিহারের পশ্চিম বাহুর একটি ভিক্ষু কক্ষ খনন করতে গিয়ে একটি কুলঙ্গির মধ্যে পাওয়া যায় ১৪টি ব্রোঞ্জের বৌদ্ধ মূর্তি। প্রত্নতাত্ত্বিকদের ধারণা জগদ্দল বিহারই লোটাস বিহার(পদ্ম মহাবিহার)। ২০১৪ সালের খননে বিহারের উত্তর বাহু খননে বেরিয়েছে পোড়া মাটির টেরাকোটা, যা বিহারের দেয়ালে সারিবদ্ধভাবে লাগানো রয়েছে।  বিহারে এ পর্যন্ত খননে বিরিয়ে এসেছে ৩৩টি ভিক্ষু কক্ষ। প্রতিটি কক্ষই বৌদ্ধ মূর্তি রাখার জন্য পৃথক ব্যবস্থা  ছিল । পাওয়া গেছে বিহারের পূর্বমুখী প্রধান প্রবেশদ্বার এবং ৮ মিটার দের্ঘ্য এবং ৮ মিটার প্রস্থের হলঘর,যেখানে আগতরা অপেক্ষা করত বিহারে প্রবেশের অনুমতির জন্য। এ হল ঘরে পাওয়া গেছে ০৪টি গ্রানাইট পাথরের পিলার যা ইতোপূর্বে বাংলাদেশের কোন বৌদ্ধ বিহারে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে পাওয়া যায়নি। পাওয়া গেছে বিহারের ছাদের ভগ্নাংশ যার পুরুত্ব ৬০ সেমি। নওগাঁর পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার, কুমিল্লার শালবন বিহার, অনন্দ বিহার, দিনাজপুরের সীতাকোট বিহারসহ দেশের কোন বিহারে ছাদের ভগ্নাংশ পাওয়া যায়নি। এতে করে প্রাচীন বৌদ্ধ বিহারের ছাদের স্বরুপ সম্পর্কে সম্যক ধারণা পাওয়া গেছে, যা প্রত্নত্ববিদ,ইতিহাসবিদ ও স্থপদিদের গবেষণার দ্বার উন্মোচন করবে। এ বিহারে ব্যবহ্নত ইট গুলি পাথর দিয়ে ঘষে মসৃণ করা হয়েছে। বিহারের বহিঃদেয়ালে চুন-বালির মিশ্রণে কারুকার্যে সাদা রং-এর লতা-পাতা,ফুল ও জীবজন্তুর অলংকার ছিল যার নমুনা পাওয়া যায় দ্বাদশ শতকের বিখ্যাত কবি সান্ধ্যাকর নন্দী কর্তৃক সংস্কৃতি ভাষায় রচিত রামচরিতম গ্রন্থে । জগদল পদ্ম মহাবিহারের পার্শ্ববর্তি ‘‘জগৎনগর বা ‘‘জগতের বিখ্যাত নগর’’কে পাল সম্রাট রামপালের হারিয়ে যাওয়া সেই ‘‘রামাবতী’’ নগরী স্থানে রয়েছে প্রত্নতাত্ত্বিকরা। প্রত্নতাত্ত্বিকদের ধারণা ব্যাপক অনুসন্ধান, উৎখনন ও গবেষণার মাধ্যমে পাল সম্রাট রামপালের রাজধানী রামাবতীর সন্ধান মিলে যেতে পারে এ জগদল বৌদ্দ বিহারে। প্রত্নতাত্ত্বিকদের ধারণা সেই রামাবতিনগর এখানেই ছিল। কেননা কাছেই রয়েছে আমইর নামে একটি জনপদ। ভৌগলিক অবস্থান,ভবন-অট্রালিকার ধ্বংসাবশেষ ও নামের সঙ্গে কিছুটা মিল থাকায় আড়ানগর, লক্ষণ পাড়ার সন্নিকটে আমাইড় গ্রামটিই রামাবতি বলে অনুমিত হয়।